ঐতিহাসিক কাবার শহর মক্কা সফর

হজ ও ইসলামের ইতিহাসের স্মৃতিবিজড়িত স্থানগুলোর সংক্ষিপ্ত বর্ণনা 

বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা কোটি কোটি মুমিনের কোন একটি স্থানে আসতে চায়? মক্কায় – কাবা বায়তুল্লাহয়।  

সূরা বাকারার ১২৫ নম্বর আয়াতে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বায়তুল্লাহর বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করতে গিয়ে مثابةً শব্দটি ব্যবহার করেছেন। 

// আর স্মরণ করুন, যখন আমরা কা’বা ঘরকে মানবজাতির প্রত্যাবর্তনস্থল ও নিরাপত্তাস্থল  করেছিলাম এবং বলেছিলাম, তোমরা মাকামে ইবরাহীমকে সালাতের স্থান রূপে গ্রহণ করো। আর ইবরাহীম ও ইসমা’ঈলকে আদেশ দিয়েছিলাম তাওয়াফকারী, ই’তিকাফকারী, রুকূ’ ও সিজদাকারীদের জন্য আমার ঘরকে পবিত্র রাখতে। //

মাসাবাতা শব্দের অর্থ প্রত্যাবর্তনস্থল। আল্লাহ্‌ তা’আলা কাবার মধ্যে এমন কিছু দিয়েছেন যে মানুষ বার বার কাবার কাছে ফিরে যেতে চায়।  মুফাসসির মুজাহিদ বলেন, ‘কোনো মানুষ কা’বা গৃহের যিয়ারত করে তৃপ্ত হয় না, বরং প্রতিবারই যিয়ারতের অধিক বাসনা নিয়ে ফিরে আসে।’ [আত-তাফসীরুস সহীহ]

মক্কায় শুধু কাবাই নয় এই পবিত্র নগরটির পুরোটাকেই আল্লাহ তা’আলা হারাম করেছেন। হারাম মানে নিষিদ্ধ, হারাম মানে সম্মানিত। 

মক্কার পাথুরে পাহাড় আর উপত্যকায় হাজার বছর আগের ইতিহাস জড়িয়ে আছে। চলুন আজ আমরা জেনে নিই মক্কার এমনই ৮টি ঐতিহাসিক ও বরকতময় স্থান সম্পর্কে, যাতে জড়িয়ে আছে প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও তাঁর মহান সাহাবিদের স্মৃতি।

১. জাবালে সাওর ও গারে সাওর: হিজরতের ইতিহাসের সাক্ষী

মক্কা থেকে মদিনায় হিজরতের সেই রোমাঞ্চকর ও যুগান্তকারী রাতের কথা ভাবলেই উঠে আসে দুর্গম ‘গারে সাওর’ বা সাওর গুহার কথা। কাফিরদের হাত থেকে পালানোর সময়ে যা ছিল রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুর আশ্রয়।

  • অবস্থান ও ভৌগোলিক পরিচয়: মসজিদুল হারাম থেকে প্রায় ৪ কিলোমিটার দূরে মক্কার দক্ষিণ প্রান্তে খাড়া হয়ে দাঁড়িয়ে আছে বিখ্যাত জাবালে সাওর। এই সাওর পাহাড়ের চূড়াতেই ঐতিহাসিক গুহাটির অবস্থান, যা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৭৬০ মিটার (পৌনে এক কিলোমিটারের মতো) উঁচুতে অবস্থিত।
  • হিজরতের কৌশল ও গুহায় আত্মগোপন: মক্কার কুরাইশরা যখন নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে হত্যার চূড়ান্ত ষড়যন্ত্রে লিপ্ত, ঠিক তখন আল্লাহর নির্দেশে তিনি প্রিয় বিশ্বস্ত সাথী হযরত আবু বকর (রা.)-কে নিয়ে গভীর রাতে গৃহত্যাগ করেন। মদিনার স্বাভাবিক রুট এড়িয়ে সম্পূর্ণ বিপরীত দিকে অবস্থিত এই দুর্গম পাহাড়ে আত্মগোপন করা ছিল নবীজীর এক অসাধারণ সামরিক ও রাজনৈতিক বুদ্ধিমত্তার পরিচয়।
  • আল্লাহর ওপর অবিচল ভরসার শিক্ষা: সূরা আত-তাওবার ৪০ নম্বর আয়াতে এই অলৌকিক মুহূর্ত স্মরণ করিয়ে আল্লাহ বলেন, 

“…যখন তারা উভয়ে গুহার মধ্যে ছিলেন, যখন তিনি তার সাথীকে বলছিলেন, ‘তুমি চিন্তিত হয়ো না, নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাদের সাথে আছেন।’ অতঃপর আল্লাহ তার ওপর প্রশান্তি নাজিল করলেন এবং তাকে এমন এক সেনাদল দিয়ে সাহায্য করলেন, যাদের তোমরা দেখতে পাওনি…”।

এ আয়াতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হিজরতের ঘটনা উল্লেখ করে দেখিয়ে দেয়া হয় যে, আল্লাহর রাসূল কোনো মানুষের সাহায্য সহযোগিতার মুখাপেক্ষী নন। আল্লাহ প্রত্যক্ষভাবে গায়েব থেকে সাহায্য করতে সক্ষম।

যখন তার আপন গোত্র ও দেশবাসী তাকে দেশ ত্যাগ করতে বাধ্য করে। সফরসঙ্গী হিসেবে একমাত্র সিদ্দীকে আকবর রাদিয়াল্লাহু আনহু ছাড়া আর কেউ ছিলনা। পদব্রজী ও অশ্বারোহী শক্ররা সর্বত্র তার খোজ করে ফিরছে। অথচ আশ্রয়স্থল কোনো মজবুত দুর্গ ছিল না।

 বরং তা এক গিরী গুহা, যার দ্বারপ্রান্তে পর্যন্ত পৌছেছিল তার শক্ররা। তখন গুহা সঙ্গী আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুর চিন্তা নিজের জন্য ছিল না, বরং তিনি এই ভেবে সন্ত্রস্ত হয়েছিলেন যে, হয়তো শক্ররা তার বন্ধুর জীবন নাশ করে দেবে, কিন্তু সে সময়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন পাহাড়ের মত অনড়, অটল ও নিশ্চিত। শুধু যে নিজের তা নয়, বরং সফর সঙ্গীকেও অভয় দিয়ে বলছিলেন, চিন্তিত হয়ো না, আল্লাহ আমাদের সাথে আছেন। (অর্থাৎ তাঁর সাহায্য আমাদের সাথে রয়েছে।) 

আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমি গিরী গুহায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে ছিলাম। তখন আমি কাফেরদের পদশব্দ শুনতে পেলাম। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! তাদের কেউ যদি পা উচিয়ে দেখে তবে আমাদের দেখতে পাবে। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, যে দুজনের সাথে আল্লাহ তৃতীয়জন তাদের ব্যাপারে তোমার কি ধারণা? [বুখারী ১৭৭]

সাওর গুহাতে জিয়ারাহর সময় সফর করলে কঠিন সময়ে আল্লাহর প্রতি অগাধ ঈমান ও নিখুঁত তাওয়াক্কুলের স্মৃতি স্মরণ করিয়ে দেয় আমাদের।

ঐতিহাসিক আরাফা প্রান্তর: হজের মূল রুকন ও ক্ষমার ময়দান

সমগ্র হজের সফরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আবেগ, কান্না আর অনুশোচনার স্থান হলো আরাফাত ময়দান। মিনা থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার এবং মুজদালিফা থেকে ৬ কিলোমিটার পূর্বে অবস্থিত এই সুবিশাল খোলা প্রান্তরটি ৯ই জিলহজ আল্লাহর খাস রহমত ও ক্ষমার চাদরে ঢেকে যায়।

  • হজের প্রধান ফরজ (ওকুফে আরাফা): জিলহজ মাসের ৯ তারিখ এই ময়দানে অবস্থান করাই হলো হজের মূল আত্মা। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পরিষ্কারভাবে ঘোষণা করেছেন, “আরাফায় অবস্থান করাই হলো হজ।”
  • বিদায় হজের খুতবা ও মসজিদে নামিরা: একটি সাধারণ ভুল ধারণা রয়েছে যে বিদায় হজের মানবতাবাদী খুতবাটি ‘জাবালে রহমত’ পাহাড়ের ওপর দেওয়া হয়েছিল। অথচ ঐতিহাসিক সত্য হলো, নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম খুতবা দিয়েছিলেন নামিরা প্রান্তরের ‘বাতনে ওরানা’ উপত্যকায়। সেখানে আজ দাঁড়িয়ে আছে সুবিশাল ‘মসজিদে নামিরা’। এই মসজিদের বিশেষত্ব হলো এর সামনের অংশ আরাফার সীমানার বাইরে এবং পেছনের অংশ সীমানার ভেতরে। তাই হাজিদেরকে অবশ্যই সতর্কতার সাথে আরাফার ভেতরের অংশে অবস্থান নিশ্চিত করতে হয়।
  • নামকরণের ইতিহাস ও সর্বশ্রেষ্ঠ দোয়া: আদম (আ.) ও হাওয়া (আ.)-এর প্রথম সাক্ষাৎ কিংবা ইব্রাহিম (আ.)-এর কোরবানির স্থান হিসেবে প্রচলিত লোককথাগুলোর নির্ভরযোগ্য ভিত্তি না থাকলেও, কুরআনে একে সরাসরি ‘আরাফাত’ বলা হয়েছে। এই ময়দানে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং পূর্ববর্তী সমস্ত নবীগণের পঠিত সবচেয়ে প্রিয় দোয়াটি হলো:

“লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারীকা লাহু, লাহুল মুলকু ওয়া লাহুল হামদু ওয়া হুয়া আলা কুল্লি শাইয়িন ক্বাদীর।”

মুযদালিফায় রাতযাপন: তারাময় খোলা আকাশের নিচে এক অপার্থিব অভিজ্ঞতা

আরাফাত ও মিনার ঠিক মাঝামাঝি জায়গায় অবস্থিত মুযদালিফা প্রান্তর হলো ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এক ‘মাশআর’ বা নিদর্শন। হারাম শরীফ থেকে এর দূরত্ব ৮ কিলোমিটারের মতো।

  • হাজিদের ইবাদত ও সান্ধ্য সফর: ৯ই জিলহজ সূর্যাস্তের সাথে সাথেই কোনো সালাত না পড়ে হাজিগণ তড়িঘড়ি করে মুযদালিফায় রওনা দেন। এখানে পৌঁছে মাগরিব ও এশার সালাত একসাথে আদায় করে তারা খোলা আকাশের নিচে কোনো তাঁবু না টাঙিয়েই মাটিতে রাত কাটান।
  • আল-মাশআরুল হারাম ও ফজরের সালাত: ১০ই জিলহজের সকালে ফজরের সালাত আদায় করে সূর্য ওঠার পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত ‘আল-মাশআরুল হারাম’-এর নিকটে দীর্ঘ মোনাজাত করেছিলেন মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। বর্তমানে এই স্থানে হাজিদের সুবিধার্থে একটি সুবিশাল ও সুন্দর মসজিদ নির্মাণ করা হয়েছে।
  • ওয়াদি মুহাসসার (আবরাহার ধ্বংসের ভয়াবহ স্মৃতি): মুযদালিফা থেকে মিনার দিকে যেতে একটি উপত্যকা পড়ে, যাকে ‘বাতনে মুহাসসার’ বা ‘ওয়াদি মুহাসসার’ বলা হয়। পবিত্র কাবার দিকে তেড়ে আসা বাদশাহ আবরাহার হস্তীবাহিনীকে ঝাঁকে ঝাঁকে আবাবিল পাখির পাথর নিক্ষেপে যে স্থানে অলৌকিকভাবে ধ্বংস করা হয়েছিল (যার উল্লেখ সূরা আল-ফীলে রয়েছে), এটি সেই অভিশপ্ত স্থান। আল্লাহর আজাব নাজিল হওয়া এই এলাকাটি দ্রুত অতিক্রম করার স্পষ্ট নির্দেশ রয়েছে।
  • শরীয়তের বিশেষ ছাড়: মুযদালিফায় পুরো রাত থাকা ওয়াজিব হলেও বৃদ্ধ, নারী, অসুস্থ ব্যক্তি ও চিকিৎসকদের জন্য বিশেষ অবকাশ রয়েছে—তারা চাইলে মধ্যরাতের পর মিনার উদ্দেশ্যে রওনা হতে পারেন।

তাবু নগরী মিনা: কোরবানি, ত্যাগ ও কঙ্কর নিক্ষেপের উপত্যকা

মক্কার পূর্ব সীমান্তে পাহাড়ঘেরা যে সুবিশাল উপত্যকাটি বিস্তৃত, তার নাম মিনা। হজের দিনগুলোতে এটি পরিণত হয় বিশ্বের সর্ববৃহৎ সাদা তাঁবুর এক অত্যাধুনিক নগরীতে।

  • হজের দিনগুলোতে মিনার গুরুত্ববহ সময়সূচি:
    • ৮ই জিলহজ: ইহরাম বেঁধে হাজিগণ মিনায় আসেন এবং সেখানে পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় করে রাত্রিযাপন করেন (যা হজের সুন্নাত)।
    • ১০ই জিলহজ: মুযদালিফা থেকে ফিরে এসে জামরাতুল আকাবায় বড় শয়তানকে পাথর মারা, কোরবানি দেওয়া ও মাথার চুল কাটার পর হাজিগণ পুনরায় মিনায় ফিরেন।
    • আইয়ামে তাশরীক (১১, ১২ ও ১৩ জিলহজ): এই দিনগুলোতে মিনায় অবস্থান করা এবং প্রতিদিন তিনটি জামরায় পাথর নিক্ষেপ করা ওয়াজিব।
  • ঐতিহাসিক মাসজিদুল খায়েফ: মিনায় অবস্থিত ঐতিহাসিক ‘মসজিদে খায়েফ’-এর মর্যাদা অত্যন্ত উঁচুতে। বর্ণিত রয়েছে, প্রিয় নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পূর্বে হযরত মুসা (আ.) সহ প্রায় ৭০ জন নবী এই পবিত্র স্থানে সালাত আদায় করেছিলেন। বিদায় হজের সময়ও রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এখানে সালাত আদায় করেন।
  • ইব্রাহিম (আ.) ও ইসমাইল (আ.)-এর ঐতিহাসিক কোরবানির স্থান: পিতাপুত্রের সেই চরম ত্যাগের স্থানটি ঠিক কোথায় ছিল, তা নিয়ে তাফসীরবিদদের ৪টি মত পাওয়া যায়:
  1. প্রথম মত: ঘটনাস্থলটি স্বয়ং মক্কা নগরীতেই ছিল (এটি সবচেয়ে শক্তিশালী মত)।
  2. দ্বিতীয় মত: মিনার জামরা বা শয়তানকে পাথর মারার জায়গার আশেপাশে এটি ঘটেছিল।
  3. তৃতীয় মত: মিনার ‘জাবাল থুবায়ের’ নামক পাহাড়ে এই ঘটনাটি ঘটে।
  4. চতুর্থ মত: এটি শামের (সিরিয়া) বায়তুল মুকাদ্দাসের নিকটবর্তী কোনো স্থানে ছিল।

পবিত্র কুরআনে এই কোরবানির বিস্তারিত বিবরণ থাকলেও মিনা শব্দটির সরাসরি উল্লেখ নেই। তবে মিনার প্রান্তর আমাদের জিকির, আল্লাহর ইবাদত ও ত্যাগের সর্বোচ্চ প্রেরণা দেয়।

নাহরে জুবাইদা: মানবকল্যাণ ও স্থাপত্যকীর্তির অসাধারণ এক দৃষ্টান্ত

মরুভূমির তীব্র দাবদাহে মক্কায় আসা পানির কষ্টে কাতর হাজিদের সুপেয় পানি পৌঁছে দিতে আব্বাসীয় খিলাফতের খলিফা হারুন-অর-রশীদের মহীয়সী স্ত্রী সাইয়্যেদা জুবাইদা বিনতে জাফর যে নজিরবিহীন উদ্যোগ নিয়েছিলেন, তা ইতিহাসে ‘নাহরে জুবাইদা’ নামে স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়েছে।

  • দীর্ঘ ৩০ বছরের প্রকৌশল সাধনা: হিজরি ১৬৪ থেকে ১৯৪ সাল পর্যন্ত সুদীর্ঘ ৩০ বছর কঠিন পাহাড় কেটে কেটে এই অবিশ্বাস্য কৃত্রিম পানির খাল বা নহর তৈরি করা হয়।
  • ৬,০০০ কেজি স্বর্ণ দান: মানবকল্যাণ ও পানির সংকট দূরীকরণে সাইয়্যেদা জুবাইদা নিজের রাজকীয় তহবিল থেকে প্রায় ৬,০০০ কেজি স্বর্ণ অকাতরে ব্যয় করেছিলেন!
  • নহরের ভৌগোলিক রুট: মক্কার পূর্ব প্রান্তের ‘ওয়াদি নোমান’ থেকে শুরু করে আরাফাহ, মুজদালিফা ও মিনা অতিক্রম করে মক্কা পর্যন্ত এই সুদীর্ঘ খাল খোদাই করা হয়। পরবর্তী প্রায় ১২০০ বছর ধরে এটি ছিল মক্কাবাসী ও হাজীদের প্রধান পানির উৎস।

আধুনিক যুগে আমাদের জন্য সামাজিক শিক্ষা:

ইসলামে তৃষ্ণার্তকে পানি পান করানো হলো অন্যতম শ্রেষ্ঠ সদকা। রানী জুবাইদার এই মহৎ কীর্তি থেকে শিক্ষা নিয়ে আজ আমাদের ঢাকা কিংবা চট্টগ্রামের মতো মেগা শহরগুলোতে পথচারীদের জন্য বিশুদ্ধ সুপেয় পানির ফিল্টার বসানো বা প্রত্যন্ত অঞ্চলে টিউবওয়েল স্থাপন করে দেওয়া হতে পারে মানবসেবার এক চমৎকার আধুনিক রূপ।

মসজিদ আল-জিন (মসজিদুল বায়াত): অদৃশ্য জগতের ঈমান আনার অলৌকিক স্থান

মসজিদুল হারাম থেকে মাত্র ১.৫ কিলোমিটার দূরে হাইয়্যুল গাজ্জায় দাঁড়িয়ে থাকা এই প্রাচীন মসজিদটি এক রোমাঞ্চকর অলৌকিক ঘটনার সাক্ষী।

এক রাতে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবী হযরত ইবনে মাসুদ (রা.)-কে সঙ্গে নিয়ে এই নির্দিষ্ট স্থানে আসেন। সেখানে জিনের একটি দল নবীজীর মুখে সুন্দর তিলাওয়াত শুনে মুগ্ধ হয়ে তাঁর কাছে সত্য ধর্মের বায়াত (শপথ) গ্রহণ করে। এ কারণে একে ‘মসজিদুল বায়াত’ও বলা হয়।

সূরা আল-জিনের শুরুর আয়াতগুলোতে জিনের ঈমান আনার এই ঘটনা সুস্পষ্টভাবে বর্ণিত আছে। হিজরি ৩য় শতাব্দীতে নির্মিত এই মসজিদটির অপর নাম ‘মসজিদুল হারাস’। যদিও নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঠিক বর্তমান দালানের ভেতরে বসেছিলেন এমন বাঁধাধরা প্রমাণ নেই, তবুও ইমাম মাকহুল (রহ.) ও সাহাবীদের বয়ানে এটি জিনের ঈমান আনার খাঁটি জায়গা হিসেবে প্রমাণিত।

 মাকবারাতুল মুয়াল্লা (জান্নাতুল মুয়াল্লা): মক্কার ঐতিহাসিক ও পবিত্র শায়িত ভূমি

মসজিদুল হারামের কাছেই ‘হায়ুল মায়াবদা’ এবং ‘হায়ুল গাজ্জা’ এলাকার মাঝখানে অবস্থিত প্রাচীনতম কবরস্থান হলো এই ‘মাকবারাতুল মুয়াল্লা’। প্রাক-ইসলামী যুগ থেকেই এখানে মরদেহ দাফন করা হতো। এখানে চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন উম্মুল মুমিনীন হযরত খাদিজা বিনতে খুয়াইলিদ (রা.), যিনি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর অত্যন্ত প্রিয়তমা স্ত্রী ছিলেন। এছাড়া বহু প্রখ্যাত সাহাবী, তাবেয়ী ও বিশিষ্ট ইসলামিক বুজুর্গরা এখানে ঘুমিয়ে আছেন।

সাধারণ মানুষ একে প্রায়ই ‘জান্নাতুল মুয়াল্লা’ বলে ডাকলেও হাদিসের সহিহ সংকলনে একে সরাসরি জান্নাত বলার মতো কোনো বর্ণনা নেই। আসলে কবরের শান্তি মানুষের ঈমান, সুকৃতি ও মহান আল্লাহর দরবারি দয়ার ওপরই নির্ভর করে।

মক্কার এই প্রতিটি ঐতিহাসিক জিয়ারাহ আমাদের ঈমানকে কেবল তাজা করে না; বরং তা আমাদেরকে একত্ববাদ, ত্যাগ ও নিখাদ মানবসেবায় জীবন উৎসর্গ করার অমর শিক্ষা দান করে।

Scroll to Top