পাহাড় ঘেরা সবুজ শহর তায়েফ: ইতিহাস, দর্শনীয় স্থান ও বর্তমান
মরুভূমির দেশ সৌদি আরব বলতেই আমাদের চোখে ভেসে ওঠে মাইলের পর মাইল বিস্তৃত তপ্ত বালু আর উত্তপ্ত আবহাওয়া। কিন্তু এই চেনা ছবির বাইরেও যে দেশটিতে চমৎকার শীতল ও সবুজ এক পাহাড়ি শহর রয়েছে, তা হয়তো অনেকেরই অজানা। পাহাড় ঘেরা সেই নান্দনিক শহরের নাম—তায়েফ। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে অনেক উঁচুতে অবস্থিত হওয়ায় এই শহরের আবহাওয়া চমৎকার আরামদায়ক। প্রাচীনকাল থেকেই পর্যটকদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে এই শহরটি।
২০২৪ সালের ২৮শে মে মক্কা নগরী থেকে আমরা রওনা হয়েছিলাম ঐতিহাসিক এই তায়েফ শহরের উদ্দেশ্যে। এই সফরের মূল উদ্দেশ্য ছিল তায়েফের ইতিহাসকে খুব কাছ থেকে জানা এবং এর ঐতিহাসিক জায়গাগুলো সচক্ষে দেখা। আজ আপনাদের জানাবো তায়েফের সেই গৌরবময় ইতিহাস, ভৌগোলিক বৈচিত্র্য ও আধুনিক রূপের কথা।
তায়েফে গোলাপের দোকান
তায়েফের আবহাওয়া ও ভৌগোলিক অবস্থান
ভৌগোলিক দিক থেকে তায়েফ সৌদি আরবের মক্কা মুকাররমা প্রদেশের অন্তর্গত একটি অত্যন্ত প্রাচীন শহর (মক্কাকে যে ১৩টি এলাকায় ভাগ করা হয়েছে, তার একটি হলো তায়েফ)। শহরটি মূলত ‘সারাওয়াত’ পর্বতমালাই পূর্ব প্রান্তে এবং সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১,৭০০ মিটার উঁচুতে অবস্থিত। এই পাহাড়ি অঞ্চলের নাম ‘জাবাল গাজওয়ান’ বা গাজওয়ান পাহাড়।
উচ্চতার কারণে এখানকার আবহাওয়া সবসময় চমৎকার নাতিশীতোষ্ণ থাকে। গ্রীষ্মকালে যেখানে সৌদি আরবের অন্যান্য প্রান্তে তাপমাত্রা আকাশছোঁয়া থাকে, সেখানে তায়েফে তাপমাত্রা ১১° থেকে ৩৯° সেলসিয়াসের মধ্যে ওঠানামা করে এবং প্রায়ই হঠাৎ মুষলধারে বৃষ্টি এসে চারপাশ জুড়িয়ে দেয়। আর শীতকালে বেশ ভালোই ঠান্ডা পড়ে, তাপমাত্রা নেমে যায় ৩° থেকে ৩০° সেলসিয়াসে। চারিদিকের সবুজ প্রকৃতি, আঙুর ও তিন ফলের চোখ জুড়ানো বাগান এই শহরের সৌন্দর্যকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। প্রায় ৮,০০০ বর্গ কিলোমিটার জুড়ে বিস্তৃত এই শান্ত ও ছিমছাম শহরে প্রায় ৪ লক্ষ মানুষের বসবাস।
তায়েফ শহরের প্রাচীন ইতিহাস: ‘উজ’ থেকে ‘আত-তায়েফ’
তায়েফ শুধু একটি সুন্দর শহরই নয়, এটি ইতিহাসের এক বিশাল ভাণ্ডার। ইসলামের আগমনের বহু আগে থেকেই এই শহরের অস্তিত্ব ছিল। প্রাচীনকালে এই অঞ্চলের সবচেয়ে আদি বাসিন্দা ছিল ‘আমালেকা’ জাতি। সে সময়ে তায়েফের নাম ছিল ‘উজ’ (واو جيم)। ধারণা করা হয়, এই নগরীতে প্রথম আগমনকারী ‘উজ ইবনে আব্দুল হাই’ নামক কবিলা বা গোত্রের নামানুসারেই তৎকালীন সময়ে এর নামকরণ করা হয়েছিল।
পরবর্তীতে ইতিহাসে নানা বংশীয় পরিবর্তন আসে। প্রথমে ‘কওমে সামুদ’ এসে আমালেকাদের তাড়িয়ে দেয়। এরপর ‘আজদ’ গোত্র এসে সামুদ জাতিকে বিতাড়িত করে। এভাবে পর্যায়ক্রমে আরবের বিভিন্ন গোত্র এখানে বসতি স্থাপন করতে থাকে। সর্বশেষ যে গোত্রটি এখানে স্থায়ীভাবে আসন গেড়েছিল, সেটি হলো ‘কবিলাতু সাকীফ’ বা সাকীফ গোত্র। প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) যখন ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে তায়েফে এসেছিলেন, তখন এই সাকীফ গোত্রই ছিল এখানকার হর্তাকর্তা।
কিন্তু এই ‘তায়েফ’ নামের রহস্য কী? সাকীফ গোত্র নিজেদের শহরকে সুরক্ষিত করতে চারপাশে একটি মজবুত প্রাচীর বা দেয়াল নির্মাণ করেছিল। আরবি শব্দ ‘ত্বইফ’ (طائف)-এর অর্থ হলো এমন কিছু যা পরিবেষ্টন করে রাখে। যেহেতু প্রাচীরটি পুরো শহরকে চারপাশ দিয়ে ঘিরে রেখেছিল, তাই এই শহরের নাম হয়ে যায় ‘আত-তায়েফ’।
তায়েফে কাবার বিকল্প গড়ার ব্যর্থ চেষ্টা ও লাত দেবী
মক্কার নিকটবর্তী হওয়া এবং উর্বর ভূমির কারণে তৎকালীন সময়ে তায়েফ ছিল এক গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক ও কৃষি কেন্দ্র। তবে মক্কার কুরাইশদের ধর্মীয় ও সামাজিক প্রাধান্যকে সাকীফ গোত্র সবসময়ই একটা চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখত। নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করতে তারা তায়েফে ‘লাত’ দেবীর জন্য একটি বিশাল উপাসনালয় নির্মাণ করে। তারা চেয়েছিল এটিকে কাবা শরীফের সমকক্ষ বা বিকল্প একটি পবিত্র স্থান (হারাম) হিসেবে গড়ে তুলতে, যাতে মানুষ মক্কার কাবার বদলে তায়েফে আসে।
তবে ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, কাবার বিকল্প তৈরির এই অপচেষ্টা কখনো সফল হয়নি। এর আগে ইয়েমেনের আবরাহা যেমন কাবার বিকল্প হিসেবে গির্জা বানিয়ে ধ্বংস হয়েছিল (যার বিবরণ পবিত্র কুরআনের সূরা আল-ফিলে রয়েছে), সাকীফ গোত্রের ভাগ্যও তেমনটাই হয়েছিল। তাদের সমস্ত প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়ে শেষ পর্যন্ত সেই উপাসনালয়টি সাধারণ কিছু প্রতিমার ঘরে পরিণত হয়েছিল।
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ঐতিহাসিক তায়েফ সফর ও ক্ষমার অনন্য অধ্যায়
ইসলামের ইতিহাসে তায়েফ এক আবেগঘন এবং হৃদয়স্পর্শী অধ্যায়। মক্কার কুরাইশদের চরম নির্যাতন এবং পরম আশ্রয়দাতা চাচা আবু তালিব ও প্রিয়তমা স্ত্রী আম্মাজান খাদিজা (রা.)-এর ইন্তেকালের পর, নবুয়তের দশম সালে আল্লাহর রাসূল (সা.) আশার আলো নিয়ে তায়েফে ইসলামের দাওয়াত দিতে যান। তাঁর সাথে ছিলেন তাঁর আজাদকৃত ক্রীতদাস জায়েদ বিন হারেসা (রা.)।
নবীজী (সা.)-এর দাওয়াত পেয়ে তায়েফের সর্দারেরা কেবল তা প্রত্যাখ্যানই করেনি, বরং শহরের বখাটে যুবকদের লেলিয়ে দিয়েছিল তাঁর পেছনে। তারা নবীজী (সা.)-এর ওপর নির্মম পাথর বৃষ্টি করে। পাথরের আঘাতে তাঁর পবিত্র শরীর রক্তাক্ত হয়ে যায়, রক্তে জুতো মোবারক আটকে যায়। জায়েদ (রা.) নিজের শরীর দিয়ে নবীজীকে বাঁচানোর চেষ্টা করে নিজেও আহত হন।
আহত অবস্থায় আল্লাহর রাসূল (সা.) ‘উতবা ইবনে শায়বা’-র একটি আঙুর বাগানে আশ্রয় নেন। সেখানে বাগানের খ্রিষ্টান কর্মচারী ‘আদ্দাস’ নবীজী (সা.)-এর পরিচয় ও মহানুভবতা দেখে ইসলাম গ্রহণ করেন। বর্তমানে তায়েফে তাঁর স্মৃতিতে ‘মসজিদে আদদাস’ রয়েছে।
এই চরম কষ্টের মুহূর্তে পাহাড়ের দায়িত্বে নিয়োজিত ফেরেশতা (মালাকুল জিবাল) এসে নবীজী (সা.)-কে বলেন, “আপনি অনুমতি দিলে আমি তায়েফের দুই পাশের পাহাড়কে একত্রিত করে এই জাতিকে পিষে ধ্বংস করে দেব।” কিন্তু ‘রহমতুল্লিল আলামিন’ নবীজী (সা.) প্রতিশোধ নেননি। তিনি বলেছিলেন, “আমি আশা করি তাদের বংশধরদের মধ্য থেকে এমন মানুষ আসবে যারা কেবল এক আল্লাহর ইবাদত করবে।” ক্ষমার এই অনন্য দৃষ্টান্তের ফলেই পরবর্তীতে পুরো তায়েফবাসী স্বেচ্ছায় ইসলাম গ্রহণ করেছিল।
ঐতিহাসিক হুনাইনের যুদ্ধ ও তায়েফবাসীদের ইসলাম গ্রহণ
হিজরতের অষ্টম বছরে কোনো রক্তপাত ছাড়াই মক্কা বিজয় সম্পন্ন হয়। মুসলমানদের এই বিশাল বিজয়ে আরবের অন্যতম যুদ্ধবাজ ও দুর্ধর্ষ গোত্র ‘সাকীফ’ এবং তাদের মিত্র ‘হাওয়াযেন’ অত্যন্ত ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে। নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে তারা জোটবদ্ধ হয়ে ‘ওয়াদি হুনাইন’ (হুনাইন উপত্যকা) নামক স্থানে যুদ্ধের প্রস্তুতি নেয়।
রাসুলুল্লাহ (সা.) ১২,০০০ সৈন্যের এক বিশাল বাহিনী (মদিনা থেকে ১০,০০০ অভিজ্ঞ যোদ্ধা এবং মক্কা বিজয়ের পর যুক্ত হওয়া ২,০০০ নতুন মুসলিম) নিয়ে শত্রুর মুখোমুখি হন। যুদ্ধের শুরুতে আকস্মিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি হলেও রাসুল (সা.)-এর অটল নেতৃত্ব এবং মুসলমানদের বীরত্বে পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আসে এবং মুসলিম বাহিনী এক ঐতিহাসিক বিজয় লাভ করে।
হুনায়নে পরাজিত হয়ে সাকীফ গোত্র তায়েফে ফিরে গিয়ে শহরের সব ফটক বন্ধ করে দেয়। নবী করীম (সা.)-এর নির্দেশে মুসলিম সেনারা তায়েফ শহর ১৫ দিন অবরুদ্ধ করে রাখেন। তবে কোনো যুদ্ধ না করেই পরবর্তীতে তারা ফিরে যান। এর পরের বছর (৯ম হিজরীতে) সাকীফ গোত্রের লোকেরা স্বেচ্ছায় মদীনায় এসে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে ইসলাম গ্রহণ করে। এই ঘটনা প্রমাণ করে, ইসলাম তরবারির জোরে নয়, বরং বিজয়ী আদর্শের সৌন্দর্য ও মহান চরিত্র দেখেই মানুষ দলে দলে গ্রহণ করেছিল।
যোগাযোগ ও আধুনিকতার ছোঁয়ায় বর্তমান তায়েফ শহর
আজকের তায়েফ সৌদি আরবের অন্যতম আধুনিক ও নান্দনিক একটি শহর। এর উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা শহরটিকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে। সৌদি আরবের প্রধান প্রধান শহরের সাথে তায়েফকে যুক্ত করতে তৈরি করা হয়েছে দুর্দান্ত কিছু হাইওয়ে:
- 🛣️ তারিক মক্কা (তায়েফ-মক্কা রোড): পবিত্র মক্কা নগরীর সাথে তায়েফের সংযোগকারী এই রোডের দৈর্ঘ্য প্রায় ৮৮ কিলোমিটার।
- 🛣️ তায়েফ-আভা রোড: আভা শহরের সাথে সংযুক্তকারী এই দীর্ঘ সড়কের দৈর্ঘ্য প্রায় ৬৩০ কিলোমিটার।
- 🛣️ তারিক রিয়াদ (তায়েফ-রিয়াদ রোড): রাজধানী রিয়াদের সাথে তায়েফকে যুক্ত করেছে এই বিশাল ৯১০ কিলোমিটারের হাইওয়ে।
শুধু প্রধান সড়কই নয়, তায়েফের আভ্যন্তরীণ গ্রামীণ রাস্তাগুলোও অত্যন্ত মনোরম। সবুজ ফসলি খেত, খামার আর চোখ জুড়ানো বাগানের বুক চিরে চলে যাওয়া এই রাস্তাগুলো ভ্রমণকারীদের দারুণ এক অভিজ্ঞতা দেয়।
তায়েফের ঐতিহাসিক দর্শনীয় স্থান ও শিক্ষা নগরী
তায়েফ যেমন ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ, তেমনি আধুনিক শিক্ষার আলোয় উদ্ভাসিত। ইসলামের বিখ্যাত পণ্ডিত ও সাহাবী হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) মক্কার পাশাপাশি তায়েফেও দ্বীনি শিক্ষার আলো ছড়াতে আসতেন। তাঁর এই আগমন তায়েফকে জ্ঞানচর্চার এক প্রাচীনতম নগরী হিসেবে মর্যাদা দিয়েছে। বর্তমানে এখানে মক্কার উম্মুল কুরা ইউনিভার্সিটির সাবেক শাখাটি স্বাধীন ‘তায়েফ ইউনিভার্সিটি’ হিসেবে শিক্ষা বিস্তার করে চলেছে।
দর্শনার্থীদের জন্য তায়েফে রয়েছে প্রাচীন বাজার ‘সুক উকাজ’ এবং উসমানীয় খিলাফত আমলে নির্মিত বেশ কিছু কেল্লা বা দুর্গ। এছাড়া ঐতিহাসিক আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) মসজিদ, মসজিদ আদদাস, মসজিদ আল-কু’ এবং ঐতিহ্যবাহী শুবরা ও ইসমাইল প্রাসাদ এই শহরের প্রাচীন আভিজাত্যের সাক্ষ্য বহন করছে। বৃষ্টি ও বন্যার পানি ধরে রাখতে এখানে প্রাচীনকাল থেকেই রয়েছে ‘সাদ্দু ওয়াদি ইকরামা’ বাঁধ।